[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১৩ ফাল্গুন ১৪৩২

ইফতারের আমেজে মুখরিত রাবি, এক মাঠে হাজারো প্রাণের মিলনমেলা

আবু বকর সৈকত

প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:০৭

ছবি- আলোকিত গৌড়

পবিত্র রমজান মাস মানেই সংযম, ত্যাগ আর ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ। রমজান মাসজুড়ে ইফতারকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসজুড়ে বিরাজ করছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

প্রতিদিন বিকেলের সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলতে শুরু করে তখন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে খোলা আকাশের নিচে চোখে পড়ে ব্যতিক্রমী সব ইফতার আয়োজনের দৃশ্য।

বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের সঙ্গে হল থেকে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকে এবং সাজিয়ে তোলে বাহারি পদের ইফতার। খেজুর, ফল, ছোলা, পিয়াজু থেকে শুরু করে নানা ঘরোয়া ও মুখরোচক খাবারে ভরে ওঠে প্রতিটি আসর। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অংশ নেয় এ মিলনমেলায়; ইফতার যেন হয়ে ওঠে কেবল খাবারের আয়োজন নয়, বরং সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব আর আন্তরিকতার এক অনন্য প্রকাশ। সবুজ ঘাসের ওপর গোল হয়ে বসে চলে ইফতারের প্রস্তুতি আর সেই সাথে আড্ডা ও পারস্পরিক কুশলাদি বিনিময়।

এই ইফতার আয়োজনে নেই কোনো বিশেষ শ্রেণিবিভেদ। হলের বন্ধু-বান্ধব, বড় ভাই-ছোট ভাই এমনকি প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও শামিল হন এই আনন্দযজ্ঞে। সবথেকে বেশি জমায়েত হতে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠ, জুবেরী মাঠ, শহীদ মিনার চত্বর, ইবলিশ চত্বর ও সাবাস বাংলাদেশ মাঠে। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর ছাদসহ বিভিন্ন বিভাগের কক্ষেও ইফতার আয়োজন করে থাকে শিক্ষার্থীরা।

গত বছরের ন্যায় এবারও অর্ধেক রমজান পর্যন্ত চালু থাকবে রাবির ক্লাস-পরীক্ষা। ক্লাস-পরীক্ষার কারণে রোজার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের থাকতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা মেসগুলোতে। পরিবারের সঙ্গে থাকলে মায়ের হাতের বাহারি আয়োজনে জমে উঠতো ইফতার। কিন্তু ক্যাম্পাসে অবস্থান করায় বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গেই ইফতার করতে হচ্ছে। এর মধ্যে থাকে বিভিন্ন বিভাগ ও ব্যাচের পক্ষ থেকে আয়োজিত ইফতার, থাকে জেলা ভিত্তিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত ইফতার।

মাঠে ইফতার করতে আসা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিম হায়দার জানান, "হলের বা মেসের চার দেয়ালের মাঝে ইফতার তো সবসময়ই করি, কিন্তু খোলা আকাশের নিচে এই সবুজ ঘাসে সবার সাথে গোল হয়ে বসার অনুভূতিই অন্যরকম। এখানে আমরা শুধু ইফতার করি না, বরং সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে বন্ধু আর বড় ভাই-ছোট ভাইদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠি। এই খোলা মাঠ যেন আমাদের সবার মিলনমেলায় পরিণত হয়, যেখানে নেই কোনো ভেদাভেদ—আছে শুধু একতা আর ভ্রাতৃত্বের এক অপূর্ব নিদর্শন। মহান আল্লাহর নিকট অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।"

তাপস রায় নামের সনাতন ধর্মের এক শিক্ষার্থী জানান, 'আমি ভিন্ন ধর্মের অনুসারী হয়েও আমার মুসলিম বন্ধুর ইফতারে অংশ নেওয়া আমার কাছে গভীর আনন্দ ও সম্মানের বিষয়। রমজান মাস মুসলমানদের জন্য পবিত্র মাস, ইফতারে আমি সেই সাধনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বন্ধুর পাশে বসি। যখন আজানের ধ্বনি ওঠে আর সবাই খেজুর হাতে নেয়, তখন আমি অনুভব করি—ধর্ম আলাদা হলেও হৃদয়ের বন্ধন এক। ইফতারের সেই মুহূর্তে আমি নিজেকে আলাদা মনে করি না; বরং একজন বন্ধু, একজন সহযাত্রী হিসেবে পাশে থাকি। আমার কাছে এটি কোনো ধর্মীয় আচার পালনের বিষয় নয়, বরং বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সম্মানের প্রকাশ।'

ইফতারের কয়েক মিনিট আগে মাঠে নেমে আসে এক পিনপতন নীরবতা। সবাই যার যার সামনে ইফতার সাজিয়ে অপেক্ষার প্রহর গোনেন মোনাজাতের জন্য। আজানের ধ্বনি শোনার সাথে সাথে খেজুর আর শরবত মুখে শুরু হয় ইফতার। মাঠের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি যেন পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে এক অপার্থিব প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়।

ক্যাম্পাসে এই ইফতার আয়োজন কেবল ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সকলের মাঝে সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার এক প্রতিচ্ছবি। দিনের তপ্ত রোদে ক্লাস-ল্যাব শেষে এই মিলনমেলা যেন প্রাণ ফিরিয়ে দেয় পুরো ক্যাম্পাসকে।

আলোকিত গৌড়/আ

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর