দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ (সোমবার, ৬ জুলাই)| দীর্ঘ ৭২ বছরের পথ চলায় নিজস্ব আলোয় আলোকিত এই বিদ্যাপীঠ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গৌরব ও ঐতিহ্য বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে|
১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই মাত্র ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়| বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে পরিসর| ১৯৫৩ সালে রোপণ করা বীজটি বর্তমানে বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়েছে|
শহিদ ড. শামসুজ্জোহার স্মৃতিবিজড়িত দেশের অন্যতম এই বিদ্যাপীঠের রয়েছে গৌরব-ঐতিহ্যের সুদীর্ঘ ইতিহাস| ব্রিটিশ আমলে রাজশাহী অঞ্চলের শিক্ষার উন্নয়নের জন্য ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী কলেজ| এই কলেজে আইন বিভাগসহ পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শ্রেণি চালু করা হলেও কিছু দিন পরেই সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়| তখনই রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজন অনুভূত হয়| ১৯৪৭ সালের দিকে রাজশাহীতে স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়|
১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে ৬৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়| একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানাতে গিয়ে কারারুদ্ধ হন ১৫ ছাত্রনেতা| পরে ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে ঢাকায় একটি ডেলিগেশন পাঠানো হয়| এভাবে একের পর এক আন্দোলনের চাপে স্থানীয় আইন পরিষদ রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়| এই আন্দোলনে একাত্ম হন পূর্ববঙ্গীয় আইনসভার সদস্য প্রখ্যাত আইনজীবী মাদার বখশ|
অবশেষে ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আইন পাশ হয়| নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইতরাত& হোসেন জুবেরীকে সঙ্গে নিয়ে মাদার বখশ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন| এর পর রাজশাহী কলেজে শুরু হয় রাবির পথচলা|
বর্তমানে ৩০৩ দশমিক ৮০ হেক্টর আয়তনের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে প্রায় ১১০০ শিক্ষক ও ২০০০ প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী| শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার (বিদেশি শিক্ষার্থীসহ)| এর প্রায় অর্ধেক ছাত্রী| বর্তমানে ১২ অনুষদের অধীনে বিভাগ রয়েছে ৫৯টি| বেড়েছে অবকাঠামো সুবিধা| ১২টি একাডেমিক ভবনসহ বর্তমানে রাবির ছাত্রদের থাকার জন্য আবাসিক হল রয়েছে মোট ১১টি ও ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ছয়টি| এছাড়া গবেষক ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক ডরমেটরি|
সুদীর্ঘ সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিয়ে অনেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান রেখেছেন| দীর্ঘ এ সময়ে রাবি ˆতরি করেছে ভাষা বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম, তাত্ত্বিক ও সমালোচক বদরুদ্দীন উমর, চলচ্চিত্র পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম, নাট্যকার মলয় ভৌমিক, মাসুম রেজা ও ক্রিকেটার আল আমিন হোসেনদের মতো অসংখ্য গুণীজনকে|
দিবসটি উপলক্ষে বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. ফরিদুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ প্রাক্তন সব শিক্ষার্থী, গবেষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন| একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় যারা অবদান রেখেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন| উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন|
৭৩তম প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক এ এইচ এম খুরশীদ আলম জানান, ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গৃহীত কর্মসূচির মধ্যে আছে—সকাল ১০:০৫ মিনিটে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পতাকা উত্তোলন; সকাল ১০:২৫ মিনিটে বেলুন, ফেস্টুন ও পায়রা অবমুক্তকরণের মাধ্যমে উদ্বোধন, ১০:৩০ মিনিটে শোভাযাত্রা এবং ১১টায় বৃক্ষরোপণ| বেলা ১১:৩০ মিনিটে সিনেট ভবনে আলোচনাসভা, বিকাল ৪ টায় বিশ^বিদ্যালয় স্টেডিয়ামে খেলাধুলা ও সন্ধ্যা ৭:১৫ মিনিটে কাজী নজরুল ইসলাম মিলায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান| বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রফেসর মো. ফরিদুল ইসলাম-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, এমপি| প্রধান আলোচক হিসেবে থাকবেন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর মো. রফিকুল ইসলাম| সম্মাননীয় অতিথি হিসেবে থাকবেন বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ফাইসুল ইসলাম ফারুকী| বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল হক মিলন, বিশ^বিদ্যালয়ের উপ- উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর মো. আব্দুল আলিম ও উপ- উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর মামুনুর রশীদ|
আলোকিত গৌড়/আ
মন্তব্য করুন: