[email protected] বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
১১ ভাদ্র ১৪৩৩

এআই থাকুক প্রস্তুতিতে, শ্রেণিকক্ষের কেন্দ্রে শিক্ষক

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ আগষ্ট ২০২৬, ১৮:১৯
আপডেট: ২৫ আগষ্ট ২০২৬ ১৮:০৮

সংগৃহিত ছবি

একটি ভালো ক্লাসের সাফল্য শুধু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের তাৎক্ষণিক উপস্থাপনার ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি, পরিকল্পনা, চিন্তা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বোঝার সক্ষমতা। আর এই প্রস্তুতির কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই হতে পারে শিক্ষকের কার্যকর সহায়ক। তবে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রযাত্রার মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট এআই শিক্ষকের বিকল্প নয়, বরং শিক্ষকের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর একটি শক্তিশালী হাত

একজন দক্ষ শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের আগেই পাঠের বিভিন্ন দিক নিয়ে চিন্তা করেন। কোন পদ্ধতিতে পাঠ উপস্থাপন করলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরি হবে, কোন বাস্তব ও প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দিয়ে জটিল বিষয় সহজে বোঝানো যাবে এবং তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের কীভাবে শেখার মূল ধারায় আনা যাবে এসব বিষয় থাকে তাঁর প্রস্তুতির অংশ। শিক্ষার্থীদের বয়স, সক্ষমতা, পূর্বজ্ঞান, শেখার ধরন ও ব্যক্তিগত পার্থক্য বিবেচনায় নিয়েই একজন শিক্ষক পাঠদানের কৌশল নির্ধারণ করেন। কারণ কার্যকর শ্রেণিকক্ষ কখনোই সব শিক্ষার্থীর জন্য একই পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় না। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে শেখার সুযোগ করে দেওয়াই একজন পেশাদার শিক্ষকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

বাংলাদেশের বিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতায় শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়। পাঠ পরিকল্পনার পাশাপাশি খাতা মূল্যায়ন, অনুশীলনী ও শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুত, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যালোচনা, মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ সবই সামলাতে হয় একজন শিক্ষককে।
এর সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিপ্রতি শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে শিক্ষক যে সময় ও যত্ন নিয়ে পাঠ পরিকল্পনা করতে চান, বাস্তব পরিস্থিতিতে সবসময় তা সম্ভব হয় না।

এমন বাস্তবতায় এআই শিক্ষকদের জন্য সম্ভাবনাময় সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে সামনে আসছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় পর্যায়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির আইসিটি পাঠ্যবইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের নতুন শিক্ষাক্রমকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে।

এআই ব্যবহার করে একজন শিক্ষক পাঠপরিকল্পনার প্রাথমিক খসড়া তৈরি করতে পারেন, শ্রেণি ও বয়স অনুযায়ী অনুশীলনী সাজাতে পারেন কিংবা কঠিন কোনো বিষয় বোঝানোর জন্য বিকল্প উদাহরণ খুঁজে নিতে পারেন। এতে শিক্ষকের সময় ও শ্রম কমতে পারে এবং পাঠ প্রস্তুতির কাজ আরও গতিশীল হতে পারে। তবে এআই কী তৈরি করছে, সেটি যাচাই করার দায়িত্ব শিক্ষকেরই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত তথ্য উপস্থাপন করতে পারলেও তার প্রতিটি তথ্য যে নির্ভুল, প্রাসঙ্গিক কিংবা শিক্ষার্থীবান্ধব হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি হওয়া উচিত ব্যবহারের আগে যাচাই।

ইসলামী জ্ঞানচর্চায় তাবাইয়ুন অর্থাৎ কোনো তথ্য গ্রহণের আগে তা যাচাই করার শিক্ষা প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ। এআইয়ের তৈরি কোনো লেখা বা শিক্ষাসামগ্রী শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের আগে শিক্ষককে দেখতে হবে তথ্যটি কতটা নির্ভরযোগ্য, ভাষা ও উপস্থাপন শিক্ষার্থীর বয়স ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং তা বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত বাস্তবতার সঙ্গে কতটা প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে ইতিহাস, বিজ্ঞান, ধর্মীয় জ্ঞান ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে এআইয়ের দেওয়া তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎস ও যথার্থতা যাচাই আরও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তি শিক্ষকের কাজকে সহজ, দক্ষ ও সময়োপযোগী করতে পারে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের মানবিক, নৈতিক ও পেশাগত ভূমিকার বিকল্প হতে পারে না। উপকার ও সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনা করে প্রযুক্তি ব্যবহারের যে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, ইসলামী জ্ঞানচর্চায় যাকে ফিকহুল মুওয়াযানাত বলা হয়, সেটিও এখানে প্রাসঙ্গিক।

শিক্ষার্থীর মুখভঙ্গি দেখে তার না-বোঝা বুঝতে পারা, প্রশ্নের ধরন দেখে তার চিন্তার জায়গা শনাক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী উৎসাহ দেওয়া কিংবা একজন পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে সময় দেওয়া এসব মানবিক দায়িত্ব কোনো প্রযুক্তিই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

তাই ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় এআইকে ভয় পাওয়ার চেয়ে সঠিকভাবে ব্যবহার করাই গুরুত্বপূর্ণ। এআই থাকুক পাঠ পরিকল্পনায়, তথ্য খোঁজায় ও প্রস্তুতিতে, আর শ্রেণিকক্ষের কেন্দ্রে থাকুন শিক্ষকই।
কারণ শিক্ষা শুধু দ্রুত উত্তর পাওয়ার বিষয় নয়। শিক্ষা হলো বুঝতে শেখা, প্রশ্ন করতে শেখা, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখা এবং শেষ পর্যন্ত একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠা।

প্রফেসর মজিবর রহমান হাওলাদার
অধ্যক্ষ, আল ইহসান একাডেমি, খিলক্ষেত, ঢাকা

আলোকিত গৌড়/আ

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর