[email protected] শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
২৩ ফাল্গুন ১৪৩২

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিয়ে চিন্তায় চীন, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে হিসাব

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭ মার্চ ২০২৬, ১০:১০

ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার সরাসরি ধাক্কা এখনো চীনের অর্থনীতিতে না লাগলেও এর প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগে কী প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে এখন হিসাব কষছে বেইজিং।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে চীনের কাছে কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে। প্রয়োজনে তারা প্রতিবেশী রাশিয়া থেকেও জ্বালানি সহায়তা নিতে পারে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে বেইজিংয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছে। সেখানে ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া, সম্পত্তি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট এবং স্থানীয় ঋণের চাপের মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

চীনা সরকার ১৯৯১ সালের পর প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা কমিয়েছে। যদিও উচ্চ প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাণিজ্যযুদ্ধও চীনের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা চীনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ ওই অঞ্চল থেকে আসে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথও ওই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে চীনের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ফিলিপ শেটলার-জোন্স বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা চললে আফ্রিকার মতো অঞ্চলেও এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ কমে গেলে ওই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত চীনের স্বার্থকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক মূলত লেনদেনভিত্তিক

পশ্চিমা অনেক বিশ্লেষক ইরানকে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখালেও বাস্তবে দুই দেশের সম্পর্ক মূলত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তেহরান সফর করেন এবং ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তি অনুযায়ী চীন ইরানে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং এর বিনিময়ে ইরান নিয়মিত তেল সরবরাহ করবে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা তাদের মোট আমদানির প্রায় ১২ শতাংশ।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের বড় অংশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

সামরিক শক্তিতে সীমাবদ্ধতা

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক শক্তি থাকলেও সামরিক দিক থেকে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

সম্প্রতি ভেনেজুয়েলা ও ইরানের ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে, এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও চীন সরাসরি তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন সাধারণত সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না এবং সামরিক জোট গঠনের বদলে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়।

কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে বেইজিং

চীন ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নিন্দা জানিয়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, কোনো সার্বভৌম দেশের নেতাকে হত্যা করে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়িয়েছে বেইজিং। চীন জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে একজন বিশেষ দূত পাঠানো হবে এবং ইতোমধ্যে ওমান ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

ট্রাম্পের সম্ভাব্য চীন সফর

এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ মাসের শেষ দিকে চীন সফরের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ানসহ স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অবস্থান বুঝতে চাইবে বেইজিং।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু পশ্চিমা দেশেই নয়, বরং উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর ওপরও বেশি পড়তে পারে।

সূত্র: বিবিসি

আলোকিত গৌড়/আ

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর