ইরানের ওপর টানা দ্বিতীয় রাতের মতো বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অভিযানে প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার দাবি করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।
সেন্টকম এক্সে প্রকাশিত এক পোস্টে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি সরঞ্জাম, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গুদাম, নৌ সক্ষমতা এবং সামরিক রসদ অবকাঠামো।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে "কঠোরভাবে আঘাত" করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। সর্বশেষ হামলার পর ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। একই ধরনের হামলা আবার হলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস, সিরিক, জাস্ক, কোনারাক, চাবাহার ও সিস্তান-বেলুচেস্তান প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ইরানশাহর বিমানবন্দরের একটি ভবন ও রানওয়েতে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দেশটির বার্তা সংস্থা আইআরএনএ। এতে একজন দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া আবু মুসা দ্বীপেও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে দাবি করেছে ইরানের গণমাধ্যম। বন্দর আব্বাসে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। চাবাহারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং বুশেহরে আইআরজিসির একটি ব্যারাক ও দপ্তরে আগুন লাগার খবরও পাওয়া গেছে। তবে হামলায় সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো জানানো হয়নি।
অন্যদিকে আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা রাতভর কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। একে তারা "আমেরিকার চুক্তিভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক জবাবের প্রথম ধাপ" বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে অঞ্চলের অন্য মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
উপসাগরীয় দেশগুলোও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কথা জানিয়েছে। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহতের দাবি করেছে এবং কাতার নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে।
এদিকে সংঘাতের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যত শেষ বলে মন্তব্য করার পর এশীয় বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৯ ডলারে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে "খুব শক্তভাবে" আঘাত করেছে এবং ইরান যতবার হামলা চালাবে, যুক্তরাষ্ট্র তার ২০ গুণ বেশি জবাব দেবে। তিনি আরও দাবি করেন, ইরান নতুন করে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে যোগাযোগ করেছে, যদিও তারা কোনো চুক্তির সম্মান রাখবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, "আমরা অশ্লীলতার জবাব অশ্লীলতা দিয়ে দিই না, বরং কাজের মাধ্যমে জবাব দিই—নির্ভীকভাবে এবং বীরত্বের সঙ্গে।"
উল্লেখ্য, গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই উভয় দেশের মধ্যে আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হলো।
সূত্র: বিবিসি
আলোকিত গৌড়/আ
মন্তব্য করুন: