[email protected] রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৯ ফাল্গুন ১৪৩২

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠিন চ্যালেঞ্জ মাদক নিয়ন্ত্রণ করা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:০৩

ফাইল ছবি

কক্সবাজার সীমান্তের ইয়াবা সমস্যা নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকট শুধু আইন প্রয়োগ বা অভিযানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলার সংসদ সদস্য হওয়ায় ইয়াবা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা জাতীয় পর্যায়েও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিনই ইয়াবার চালান দেশে প্রবেশ করছে। গত দুই বছরে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিনে গড়ে লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ করেছে। তবে জব্দের সংখ্যা বাড়লেও বাজারে ইয়াবার সহজলভ্যতা কমেনি। স্থানীয়দের মতে, সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় জব্দের পরিমাণও বাড়ছে।

স্থানীয়রা বলছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ নিজ জেলা হওয়ায় সমস্যার গভীরতা, দুর্বলতা ও গডফাদারদের বিষয়ে অবগত। তাই তার কাছে প্রত্যাশাও বেশি। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের ওপরও চাপ বেড়েছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ ও টেকনাফ মডেল থানার কর্মকর্তারা জানান, নতুন মন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ইয়াবা রুট, মাঝরাতের নৌ চলাচল এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক তৎপরতা নিয়ে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

প্রশাসন সূত্র জানায়, সীমান্তে নতুন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর অপারেশনাল মডেল চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। ড্রোন নজরদারি, সীমান্তের ১২টি প্রধান রুটে বিশেষ মোবাইল ইউনিট, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ইয়াবা মামলার তদন্তে সিআইডি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও বিজিবির যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে।

মাদকবিরোধী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরোনো পদ্ধতিতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না আসায় এবার মডেল বদল জরুরি। নতুন মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম তিন থেকে ছয় মাসই বলে দেবে দীর্ঘদিনের মাদক চক্র ভাঙতে সরকার কতটা সক্ষম।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) কক্সবাজারের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল জানান, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জেলায় ১৪৪টি ইয়াবা মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে ১০৩ জন সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। ২৪ মামলায় ৩০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাঠানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় লিংকগুলো অনেক সময় রোহিঙ্গা চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পাহাড়ি রুট, নৌ চলাচল এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ গোপন পথ পাচারকারীদের সহায়তা করছে।

ড্রাগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন এই কর্মকর্তা। তার মতে, বড় চালান ধরতে আরও ড্রাগ ডিটেকশন ডগ ও আধুনিক স্ক্যানার প্রয়োজন। কক্সবাজারে রেল সংযোগ চালুর পর স্থলপথের পাশাপাশি রেললাইনও পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘শুধু আইন দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তন না হলে সীমান্তে অভিযান চালিয়েও বড় পরিবর্তন আসবে না।’

তিনি জানান, উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজারে বহু মানুষ আর্থিক সংকটে রয়েছেন। বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে পাচারচক্র যুবকদের প্রলুব্ধ করছে। বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে ইয়াবা নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়বে।

এসপি আরও বলেন, পরিবারভিত্তিকভাবে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। একজন যুবক যদি দৈনিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় করতে পারে, তাহলে ১০-১৫ হাজার টাকার প্রলোভনে সে জীবনঝুঁকিপূর্ণ পথে যাবে না। তাই টেকসই সমাধানের জন্য কর্মসংস্থান ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারের মাদক সংকট শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সীমান্তভিত্তিক নতুন কৌশল কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

আলোকিত গৌড়/আ

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর