[email protected] শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

ঘন ঘন ভূমিকম্পে বাড়ছে শঙ্কা, ফেব্রুয়ারিতে ১০–১১ দফা কম্পন অনুভূত

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৩

ফাইল ছবি

দেশে ঘন ঘন ভূমিকম্প নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সর্বশেষ গতকাল (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে মাঝারি মাত্রার একটি ভূকম্পন অনুভূত হয়। উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকা। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এ কম্পনে জেলার বিভিন্ন স্থানে কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরায় সৃষ্ট কম্পন রাজধানী ঢাকা হয়ে পূর্বে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অনুভূত হয়।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর-এর আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানান, সর্বশেষ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৪, যা মাঝারি মাত্রার। ইউরোপীয় ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (ইএমএসসি) জানায়, এর উৎপত্তিস্থল খুলনা শহর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং সাতক্ষীরা থেকে ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে; গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৫ কিলোমিটার।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুমার নামাজের পরপরই হঠাৎ ঝাঁকুনি শুরু হলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মুসল্লি মসজিদ ছেড়ে খোলা স্থানে বেরিয়ে আসেন। শহরের বহুতল ভবনের বাসিন্দারাও রাস্তায় নেমে আসেন। আশাশুনি, তালা ও কলারোয়া উপজেলার কয়েকটি এলাকায় মাটির ও টিনশেড ঘরবাড়ি ধসে পড়ার খবর মিলেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে এত তীব্র ঝাঁকুনি তারা দেখেননি।

চলতি ফেব্রুয়ারিতে একের পর এক কম্পন অনুভূত হয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি একই দিনে একাধিকবার কেঁপে ওঠে দেশ; সেদিন সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার কম্পন রেকর্ড হয়। একই সময়ে মিয়ানমারে ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটে আরও দুটি কম্পন টের পাওয়া যায়। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ৫ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি কম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারে। ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের সিকিমে ৩ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে। সর্বশেষ ২৭ ফেব্রুয়ারির ৫ দশমিক ৪ মাত্রার কম্পন মিলিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১০; গতকালের দুই দফা কম্পন আলাদা করে ধরলে ১১।

এর আগে গত নভেম্বরে ঘন ঘন ভূমিকম্পে সারা দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশের অধিকাংশ এলাকা। প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। পরদিন আরও তিনটি ভূমিকম্প হয়। তখন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না—প্রস্তুতি বাড়াতে হবে এখনই।

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত, ফলে এখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি ঐতিহাসিকভাবেই বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, সাতক্ষীরা অঞ্চল তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকলেও উত্তর ও পূর্বাঞ্চল উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকাকে মাঝারি ঝুঁকির মধ্যে ধরা হলেও ঘনবসতি ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের কারণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবনের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার যৌথ জরিপে বলা হয়েছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে অন্তত ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবনের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বিভিন্ন মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়; তবে সঠিক পরিকল্পনা, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

আলোকিত গৌড়/আ

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর