মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং যত দ্রুত সম্ভব দেশটির শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে যৌথ ব্রিফিংয়ে তিনি এ আহ্বান জানান।
যৌথ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম যে কয়েকটি শুভেচ্ছা ফোনকল তিনি পেয়েছিলেন, তার একটি ছিল আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছ থেকে। সে সময় মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আনোয়ারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর এবং মালয়েশিায় আসতে পেরে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন।
এ সময় তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মালয়েশিয়া সফরের কথাও স্মরণ করেন। তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের মালয়েশিয়া সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছিল এবং শ্রমশক্তি সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। একইভাবে ১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়ার সফর দুই দেশের বন্ধুত্ব আরও গভীর করে এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে উভয় পক্ষ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। যৌথ কমিশনের বৈঠক এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক পরামর্শের মতো বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে সহযোগিতা আরও বাড়াতে একমত হয়েছে দুই দেশ। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি শক্তিশালী জনসমর্থন পেয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। এ লক্ষ্যে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের সেই সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, দুই নেতার আলোচনায় তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সেমিকন্ডাক্টরসহ উচ্চমূল্য সংযোজিত বিভিন্ন খাত গুরুত্ব পেয়েছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মরত ও অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী এবং উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। তাদের অবদান দুই দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে তিনি আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং দ্রুত শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করেছেন। এ বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে যে, কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী হতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং কর্মীদের ব্যয়ও হ্রাস পায়।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা চায় এবং আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি)-এ যোগদানে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সংযুক্তির প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতেও দুই নেতা মতবিনিময় করেছেন বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে দুই দেশ। পাশাপাশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন দেওয়ায় মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
যৌথ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদিন যেসব দ্বিপাক্ষিক দলিল স্বাক্ষর ও বিনিময় হয়েছে, সেগুলোকে তিনি স্বাগত জানান। তার মতে, এসব উদ্যোগ দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিবাচক গতিশীলতা ধরে রাখতে সহায়ক হবে।
সবশেষে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এদিনের আলোচনা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। যৌথ সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চাইলে আমি এখন এটার একটা ছোট, ঝরঝরে অনলাইন নিউজ ভার্সন বা কয়েকটা বিকল্প হেডলাইনও দিতে পারি।
আলোকিত গৌড়/আ
মন্তব্য করুন: