[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
২২ আশ্বিন ১৪৩৩

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার সরকারের

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৫

ফাইল ছবি

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, ডায়াগনস্টিক কিট, ওষুধ ও স্যালাইন সরবরাহ নিশ্চিত করেছে সরকার। সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জন্য ডেঙ্গু চিকিৎসা সহজলভ্য করা, ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর কারণে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার ০.৩১ শতাংশে রাখা সম্ভব হয়েছে। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয় এবং মৃত্যুহার ছিল ০.৫৩ শতাংশ। ২০২৪ সালে ৪৮২ জনের মৃত্যুতে মৃত্যুহার ছিল ০.৪৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে ৩২৩ জনের মৃত্যুতে এই হার দাঁড়ায় ০.৩৪ শতাংশে। গত বছরের একই সময়ে মৃত্যুহার ছিল ০.৪২ শতাংশ।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ডেঙ্গু মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানো, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ও ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু, পর্যাপ্ত ডায়াগনস্টিক কিট ও স্যালাইন মজুত এবং সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু এনএস১ পরীক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ২২৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের দুটি ফ্লোরকে ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে হাসপাতালের ডেঙ্গু চিকিৎসার শয্যা সংখ্যা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ২০০ করা হয়েছে। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ২০টি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৪০টি শয্যা ছিল।

হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম জানান, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। ফলে রোগীদের ওয়ার্ড থেকে বের না হয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি জানান, ডেঙ্গু চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের নিয়ে সম্প্রতি ইন-হাউস সেমিনার করা হয়েছে। পাশাপাশি মেডিসিন ও শিশু বিভাগের চিকিৎসকেরা নিয়মিত সকালে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা নিয়ে সেশন পরিচালনা করছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে পৃথক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে ২৩১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। বর্তমানে ৪০২, ৫০২ ও ৭০২ নম্বর ডেডিকেটেড ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডটি নারী রোগীদের জন্য নির্ধারিত।

ঢামেক ডেঙ্গু ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক শাহনুর শারমিন মুন্নি জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডের নির্ধারিত ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০টি শয্যা হলেও রোগীর সংখ্যা বাড়লে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় আইভি ফ্লুইড, আইভি সেট, প্যারাসিটামল, বমি ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ এবং প্লাজমা সলিউশনের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালেও চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান জানান, অষ্টম তলায় নতুন করে ১০০টি শয্যা চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি পুরুষ ও ৫০টি নারী রোগীর জন্য রাখা হয়েছে।

তিনি জানান, বিদ্যমান স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য আলাদাভাবে ছয়জন চিকিৎসক ও ১০ জন নার্স নিয়োগ দিয়েছে। ১ হাজার ২০০ শয্যার এই হাসপাতালে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ১০৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। জরুরি বিভাগের ৫০টি শয্যার পাশাপাশি প্রায় ২০০টি শয্যা বিশেষভাবে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য রাখা হয়েছে।

তবে সব ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না বলে জানিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান। গুরুতর রক্তপাত, তীব্র ডায়রিয়া বা অনিয়ন্ত্রিত বমির মতো উপসর্গ থাকা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রোগীকে সাধারণত নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে ডেঙ্গু সংক্রমণের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হটস্পট হিসেবে খুলনা চিহ্নিত হওয়ায় সেখানেও চিকিৎসা ও পরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। খুলনা শহরের বিভিন্ন স্থানে নয়টি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সপ্তাহজুড়ে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারটি ওয়ার্ড ও সংলগ্ন বারান্দায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক দিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে হাসপাতালে ৩০টি শয্যা সরবরাহ করা হয়েছে। এতে হাসপাতালটির ডেঙ্গু চিকিৎসার মোট শয্যা সক্ষমতা ১৫০টিতে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীদের ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া খুলনা ডায়াবেটিক সমিতিতে মাত্র ১০০ টাকা খরচে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. নুরুল ইসলাম জানান, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেওয়ায় রোগীর চাপ সামলাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ফিল্ড হাসপাতালটি পুনরায় চালু করার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার।

তিনি জানান, ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য জায়গা তৈরি করতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

ডা. নুরুল ইসলাম আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের স্যালাইন মজুতের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আগামী মাসগুলোর সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) ও এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডিসিএল) পর্যাপ্ত মজুত বজায় রাখতে বলা হয়েছে।

তিনি জানান, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইডস কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশকে পাঁচ লাখ ডেঙ্গু এনএস১ র‌্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট কিট দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশের যেকোনো এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডেঙ্গু চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী রোগী শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ভুলের কারণে মৃত্যু ঠেকাতে ১ হাজার ৬০০ চিকিৎসককে ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালেই যেন ডেঙ্গু থেকে নতুন করে সংক্রমণ না ছড়ায়, সে জন্য রোগীদের মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আলোকিত গৌড়/আ

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর